জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, সুদানের গৃহযুদ্ধের সময় সশস্ত্র পুরুষরা ছোট শিশুদেরও ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করছে। তাদের মধ্যে ১ বছরের শিশুও ছিল। প্রায় দুই বছরের সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে দেশটিতে।
সুদানের ছোট শিশুদের ওপরও ধর্ষণ চালানোর বিষয়টি ইউনিসেফ প্রতিবেদনে প্রথম জানিয়েছে।এক তৃতীয়াংশ পুরুষ এই ঘটনা ঘটিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, ভুক্তভোগীরা এ ধরনের ধরনের অপরাধের সম্পর্কে অভিযোগ করতে এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য চাইতে ‘বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।’
ইউনিসেফ বলেছে, যদিও ২০২৪ সালের শুরু থেকে শিশুদের বিরুদ্ধে ২২১টি ধর্ষণের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে, তবে প্রকৃত সংখ্যাটি সম্ভবত আরো অনেক বেশি।
সুদান সামাজিকভাবে রক্ষণশীল একটি দেশ।সমাজের কারণে ভুক্তভোগী এবং তাদের পরিবার ধর্ষণ সম্পর্কে কথা বলতে চায় না, আবার রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে প্রতিশোধের ভয়। ইউনিসেফের প্রতিবেদনটি দেশটির গৃহযুদ্ধে শিশুদের ওপর চালানো নির্যাতনের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক খবর হলো, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স পাঁচ বছরের কম, যার মধ্যে চারটি শিশুও ছিল। ইউনিসেফ এ ঘটনার জন্য কে দায়ি তা প্রতিবেদনে জানায়নি।
তবে জাতিসংঘের অন্যান্য তদন্তে বেশিরভাগ ধর্ষণের জন্য আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-কে দায়ি করেছে। তারা বলেছে, আরএসএফ যোদ্ধারা বেসামরিক লোকদের আতঙ্কিত করতে এবং তাদের বিরোধিতা দমন করতে যৌন সহিংসতা চালায়।
আরএসএফ তোদের সাবেক মিত্র সুদানিজ সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে লড়ছে। তবে তারা কোনো ধরনের অন্যায় কাজ করার কথা অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ চান্দে ওথমান অক্টোবরে তাদের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘সুদানে আমরা যে মাত্রার যৌন সহিংসতা নথিভুক্ত করেছি তা বিস্ময়কর’।
সুদানের জন্য জাতিসংঘের মানবিক প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত তহবিল পায়নি। মার্কিন সাহায্যের সাম্প্রতিক কর্তন ভুক্তভোগীদের সাহায্য করার কর্মসূচিগুলো আরো আরো কমিয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা
ঘটনা স্মরণ করে ওমনিয়া (তার আসল নাম নয়) নামে এক নারী বলেছেন, ‘রাত নয়টার পর কেউ একজন দরজা খুলে চাবুক হাতে নিয়ে একজন মেয়েকে বেছে নেয় এবং অন্য ঘরে নিয়ে যায়। আমি ছোট্ট মেয়েটির কান্না এবং চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তারা তাকে ধর্ষণ করছিল।’
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা অন্য নারী এবং মেয়েদের সঙ্গে একটি ঘরে আটকে রেখেছিল। ওমনিয়া বলেন, ‘প্রতিবারই তারা তাকে ধর্ষণ করত, এই মেয়েটি রক্তাক্ত অবস্থায় ফিরে আসত। সে এখনও একটি ছোট শিশু। রাতে নিয়ে গেলে কেবল ভোরেই মেয়েটির মুক্তি মিলত। সবাই প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় ফিরে আসত। তাদের প্রত্যেকেই কাঁদে এবং অসংলগ্নভাবে কথা বলে। সেখানে ১৯ দিন আমি কাটিয়েছি। আমি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিলাম যে আমার জীবন শেষ করে ফেলতে চেয়েছিলাম।’
যুদ্ধে ভেঙে পড়া একটি জাতি হিসেবে সুদান পৃথিবীর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং স্থানগুলোর মধ্যে একটি। যেখানে পরিষেবা এবং ফ্রন্টলাইন কর্মীদের প্রবেশাধিকার পাওয়া কষ্টকর। যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুদের আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলেছে। প্রতি চারজন স্কুল-বয়সী মেয়ের মধ্যে তিনজন স্কুলে যেতে পারে না বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
এই অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি আরো খারাপ হচ্ছে। কারণ ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য খুব কম জায়গা রয়েছে। অনেক চিকিৎসা সুবিধা যুদ্ধরত পক্ষগুলো ধ্বংস, লুটপাট বা দখল করেছে। সাম্প্রতিক মার্কিন সাহায্য হ্রাসের কারণে শিশুদের সুরক্ষার জন্য উপলব্ধ সীমিত পরিষেবাগুলোকেও বিপন্ন করে তুলছে।
ইউনিসেফ স্থানীয় কর্মীদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শিশুদের জন্য নিরাপদ স্থান প্রদান করছে। কর্মীরা মার্কিন সাহায্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। সুদানের মানবাধিকার কর্মী সুলাইমা এলখলিফা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবেলায় একটি সরকারি ইউনিট পরিচালনা করেন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগটি সংগঠিত করতে সহায়তা করেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘সশস্ত্র পুরুষদের দ্বারা ধর্ষিত নারীদের হতাশ হওয়ার বিলাসিতা নেই এখানে।’ তিনি আরো জানান, যুদ্ধের চাহিদা যেমন, খাবার খুঁজে বের করা, পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন, মানসিক আঘাত মোকাবেলা করার জন্যও কোনো জায়গা নেই।’